বাণিজ্যযুদ্ধের ধাক্কা সামলে প্রথম প্রান্তিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি চীনে

শুল্কজনিত যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ বেইজিংয়ের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের বাধা হতে পারে, সব পূর্বাভাসেই এমনটা বলা হচ্ছে।

শুল্কজনিত যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ বেইজিংয়ের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের বাধা হতে পারে, সব পূর্বাভাসেই এমনটা বলা হচ্ছে। কারণ এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় শিকার চীন। এমন উত্তেজনার মাঝেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি। এ সময় ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় চীনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। চীনা পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে শতভাগের বেশি শুল্ক প্রযোজ্য হচ্ছে। আর গত প্রান্তিকে সর্বোচ্চ শুল্ক ছিল ২০ শতাংশ। খবর এফটি।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে জিডিপির তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রথম দফায় অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরও মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে, যা কিনা গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বার্ষিক প্রবৃদ্ধির সমতুল্য।

জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের জন্য বেইজিংয়ের নির্ধারিত লক্ষ্য এবং রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকদের দেয়া ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পূর্ণ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে চীনের অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে।

এনবিএসের ডেপুটি কমিশনার শেং লাইইউনের মতে, প্রথম প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতিতে ভালো সূচনা হয়েছে। কিন্তু চীনের জন্য বৈদেশিক বাণিজ্য দিন দিন জটিল ও কঠিন হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো এখনো দুর্বল। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের ভিত্তি আরো সুসংহত করা প্রয়োজন।

গতকালও চীনের পুঁজিবাজার নিম্নমুখী ছিল। দিনের শুরুতে হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে যায় এবং চীনের মূল ভূখণ্ডে সিএসআই ৩০০ সূচক কমে দশমিক ৯ শতাংশ। স্থানীয় মুদ্রা দশমিক ১৫ শতাংশ দুর্বল হয়ে ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩২৬ রেনমিনবি।

চীন চলতি বছরের জন্য ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অনেক বিশ্লেষক একে উচ্চাভিলাষী বললেও দেশটির নীতিনির্ধারকরা রেকর্ড বাজেট ঘাটতির মাধ্যমে প্রণোদনা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা চীনের জন্য দেয়া পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে এনেছেন। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলি ২০২৫ সালে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৪ দশমিক ৫ হওয়ার পূর্বাভাস দিলেও সম্প্রতি তা কমিয়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ করেছে। এছাড়া দেশটির জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইউবিএস ৩ দশমিক ৪ এবং মার্কিন গোল্ডম্যান স্যাকস ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস দিয়েছে।

ডাচ বহুজাতিক ব্যাংক আইএনজির গ্রেটার চায়না বিভাগের প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং বলেন, ‘পুরো বছরের জিডিপি লক্ষ্য পূরণে প্রথম প্রান্তিক জোরালো শুরু হওয়া চীনের জন্য জরুরি ছিল। প্রথম প্রান্তিকে শিল্পোৎপাদনের উচ্চ হার আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির অগ্রিম সরবরাহের ফলে হতে পারে। তাই আমাদের দেখতে হবে পরবর্তী কয়েক মাস কেমন যায়।’

অন্যদিকে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দ্বিতীয় প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। কারণ মার্কিন বাড়তি শুল্কের প্রবল চাপ এবং আগাম রফতানির ফলে নতুন সরবরাহ কমে যাওয়া।

জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর দফায় দফায় শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেশির ভাগ উচ্চ শুল্ক এখন স্থগিত থাকলেও চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর রয়েছে। তবে স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিকসের মতো পণ্যে অস্থায়ী ছাড় দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে চীন।

পাল্টাপাল্টি শুল্কের মাঝে দুই দেশই অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে। গত মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া বক্তব্য অনুসারে, বাণিজ্যের জন্য চীনকেই আলোচনায় বসতে হবে। কারণ ওয়াশিংটনের প্রয়োজন না হলেও অর্থের জন্য বেইজিংকে চুক্তিতে যেতে হবে। তবে চীনের হংকং ও ম্যাকাও বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক শিয়া বাওলং বলেন, ‘চীনকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না।’

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের স্মৃতিকথা ‘হিলিবিলি এলিজি’কে কটাক্ষ করে বাওলং বলেন, ‘মার্কিন “হিলবিলিরা” (অনাধুনিক ও অশিক্ষিত) চীনের পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার সামনে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করুক।’

সব মিলিয়ে চীনের প্রবৃদ্ধি পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে প্রকাশ হলো যখন দেশটির সাধারণ মানুষ সম্পত্তি খাতে মন্দার কারণে অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, যা ভোক্তা আস্থা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। যদিও এনবিএস জানিয়েছে, মার্চে খুচরা বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা বিশ্লেষকদের ৪ দশমিক ২ শতাংশ পূর্বাভাস এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির ৪ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। মার্চে শিল্পোৎপাদন ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ৯। এটি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস থেকেও বেশি।

গৃহস্থালি খাতে দুর্বল চাহিদা থেকে আসা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় চীনের নীতিনির্ধারকরা উৎপাদন ও রফতানির ওপর নির্ভর করেছেন। বাণিজ্যিক উত্তেজনার মধ্যেও গত বছর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার।

গত সোমবার প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডলারের হিসেবে মার্চে চীনা রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যা অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এ সময় আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

আরও